আমাদের কথা

by Vinnokatha

পথ চলা শুরু হয়েছিল সেই ২০২১- ২০২২ সালে। নাম ছিল ‘চেতনা’।বছরখানেক চলেছিল। পরে কিছু সমস্যার  কারণে পোর্টাল বন্ধ করতে হয়। কিন্তু আমরা না থেমে আবার নতুন উদ্যমে শুরু করি ‘ভিন্নকথা’ ওয়েব পোর্টাল। ২০২২শের সেপ্টম্বর থেকে আজ পর্যন্ত, আমরা একরকম জোড়াতালি দিয়ে চলছি।কিন্তু জোড়াতালি বা  থমকে থমকে কেন চলতে হচ্ছে? কারণ অনেক।বিস্তারিত বলতে হলে আলাদা একটি বই লিখতে হবে। এখানে কী লাভ সেসব কথায়! তার চেয়ে বরং কেন ‘ভিন্নকথা’ সেই বিষয়টি বলি।  

আসলে বাংলায় ভদ্রবেশী সমন্বয় ও সম্প্রতিবাদীদের দাপট এত বেশি যে ভিন্নকথা বলার লোক নেই বললেই চলে। সহাবস্থান সম্প্রীতির পোস্টার পাড়ার অলিতে গলিতে।উপর থেকে দেখে মনে হবে মানুষে মানুষে ভালোবাসা উপচে পড়ছে। অসাম্য, অভাব, জাতপাত, হিংসা, বিদ্বেষ, শোষণ, বঞ্চনা, লুট বাংলার মানুষদের কখনও বোধহয় আলিঙ্গন করেনি। কিন্তু একথা অনায়াসে বলা যায় যে বাংলার বহুজন সংস্কৃতি সংখ্যালঘু  উচ্চবর্ণের ও উচ্চবিত্তের সীমাহীন ও ক্ষমাহীন অশালীনতার দাপটে একঘরে। এখানে বহুজনরা একরকম  অচ্ছুৎ। বহুজন শ্রমজীবী, বহুজন মেহনতকারী এখানে আসে বিকৃতরুপে। নিছক বাবুদের মনোরঞ্জনের জন্য। এই  বিকৃতির মূলে আছে হাজার হাজার বছরের উচ্চবর্ণের  পরজীবীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শোষণ ও বেইমানি। এর উদাহরণ পেয়ে যায় রামায়ণে। নিম্নবর্ণের দ্রাবিড় সহযোগীরা হয় বানর সেনা, যারা মনুষ্য পদবাচ্য নয়।কিন্তু  প্রান্তিক মানুষদের নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি আছে।তাঁদের স্বকীয় জীবনবোধ আছে। আছে জীবন চেতনা। আজ তা নিছক বাজারের দালালদের হাতে পড়ে ও তাদের আশ্রিত সর্বগ্রাসী প্লাস্টিক সংস্কৃতির ফাঁদে পড়ে মাথা তুলে দাঁড়ানোর ক্ষমতা নয়, সাহস হারিয়েছে। আজ দিন এসেছে দেশের শিকড়হীন দালালদের বাজারি প্লাস্টিক  সংস্কৃতি্র প্রচার ও প্রসারকে রুখে দেওয়ার। কিন্তু শুধু মুখে বলে বা লিখে এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে প্রতিহত করা সম্ভব কি? মনে হয় না।                       
মূল বিষয়টি সংক্ষেপে এভাবে তুলে ধরা যেতে পারে। বহু বছর ধরে অগণন মানুষের জীবন সংগ্রাম এবং সেই ভিত্তিতে চিন্তা ভাবনার ফসল বর্তমান মানব সভ্যতা। গোষ্ঠী ব্যবস্থার পরবর্তী সময়ে ব্যক্তি মালিকানা ব্যবস্থার শুরুর থেকেই মানব জাতি শোষক ও শোষিতে বিভাজিত। ধরন ভিন্ন হলেও এদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা দেখতে পাই শোষক-শোষিতের বৈরী দ্বন্দ্বে এবং শাসকের আধিপত্যে শোষিত বহুজনদের সৃষ্টি, কৃষ্টি, সংস্কৃতি প্রায় রুদ্ধ। তাঁদের সংগ্রামের ইতিহাসকে বিকৃত করার ও চলমান জীবন সংগ্রামকে জনমানস থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার নিরলস অপপ্রয়াস। জীবন-যাপন, সৃজন-সংস্কৃতির উপর শোষক-শাসকের নিরন্তর আগ্রাসন ও অবদমন। স্বাভাবিকভাবেই দেশি-বিদেশি শোষকশ্রেণী (বুর্জোয়া) নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং সেখানে প্রকাশিত বুদ্ধিজীবীদের তাত্ত্বিক আলোচনায় হাজার হাজার বছর ধরে নিপীড়িত বহুজনদের দৈনন্দিন জীবন সংগ্রামের দহন, পীড়ন ও যন্ত্রনা প্রতিফলিত হওয়া এবং সেই সঙ্গে তাঁদের মুক্তির পথকে প্রশস্ত করা সম্ভব না। ভদ্রবিত্তের বাইরে থাকা অগণিত শ্রমজীবি, শ্রমিক, কৃষক সহ অন্যান্য মেহনতি জনতা ও অবদমিতদের জীবন সংগ্রাম ও তাঁদের সৃষ্টি, কৃষ্টিকে তাদেরই ভাষায় তুলে ধরতে ‘ভিন্নকথা’ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সহজ কথায় ‘ভিন্নকথা’ শোষিত, নিপীড়িত ও প্রান্তিক মানুষদের জীবন সংগ্রামের বাস্তব জীবনচিত্র ও জীবন আলেখ্য।  

‘ভিন্নকথা’ মূলত মেহনতকারী প্রান্তিক মানুষদের কথা। হাতেগোনা ভদ্রবিত্তের বাইরের অগুনিত মানুষের হাড়ভাঙ্গা শ্রমের কথা, সভ্যতা নির্মাণে তাঁদের অবদানের কথা। তাদের জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত, লড়াই ও নির্যাতনের কথা।তাঁদের সমস্যার কথা তাঁদের ভাষায়।  

এই পোর্টালের মুখ্য কাজ ঠাণ্ডা ঘরে বসে মানুষের মুক্তি নিয়ে কচকচানি নয়। আমরা বুঝেছি এসব কেবলমাত্র শুধু সময়ের ও শক্তির অপচয়ই নয়, এটি দেশি ও বিদেশি বুর্জোয়াদের মদতপুষ্ট ও রসদপুষ্ট  তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের একটি ক্ষমাহীন বিশ্বাসঘাতকতা। এরা সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের শত্রু। এই পোর্টাল তাঁদের কথায় বলে যারা যুগ যুগ ধরে নির্যাতিত শোষিত বঞ্চিত অবহেলিত। এঁরাই গা গতরে খেটে খাওয়া বহুজন। এঁদের কৃষ্টি সংস্কৃতি দৈনন্দিন মরা বাঁচার লড়াই এখানে স্থান পায় ও পাবে। অগণিত শোষিত মানুষের সংগ্রাম, দুঃখ-সুখ, ব্যথা যন্ত্রণা তাঁদের মত করে তুলে ধরবে ‘ভিন্নকথা’। হাজার বাজারি  পোর্টাল থেকে এটি এখানেই আলাদা। বাজার বৃদ্ধি নয়, মেহনতি মানুষের মুক্তি কোন পথে-এ নিয়েই ‘ভিন্নিকথা’র কাজ। এবং এ কাজ নিরবিচ্ছিন্নভাবে নিরলস পরিশ্রমে ও আমাদের যৌথ ত্যাগ, দায়বদ্ধতায় ও একাগ্রতায় চলবে। খেটে খাওয়া মানুষই আমাদের শক্তি এবং তাদের মুক্তির লক্ষেই ভিন্নিকথা। এখানে জার্মান শিল্পী বার্টোল্ট ব্রেখটের (১৮৯৮-১৯৫৬) কবিতা ‘কোশ্চেনস ফ্রম এ ওয়ার্কার হু রিডস’ থেকে কয়েক লাইন তুলে ধরা হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে নাঃ   

Who built Thebes of the 7 gates ? 
 In the books you will read the names of kings. 
 Did the kings haul up the lumps of rock? 

অর্থাৎ, থিবস নগর প্রকৃত অর্থে কারা পত্তন করেছিলেন? বইয়ে অনেক রাজার নাম আছে।সেই রাজারা কি পাথরের চাই টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এসেছিলেন? 

উৎপাদন ব্যবস্থাকে সচল রেখেছেন কারা? মেহনতি মানুষেরা।সমাজের ভিত্তির মূলে কারা আছেন? উৎপাদকেরা। আর এই অসংখ্য উৎপাদকদের সবরকমের শোষণের মাধ্যমে টিকে রয়েছে মুষ্টিমেয় পরজীবী শাসক ও শোষক। আর এই পরজীবীদের লাগামহীন শোষণের শিকার সাধারণ মানুষ। একদিকে হাতেগোনা কিছু মানুষের হাতে আছে বিশাল পুঁজি। অন্যদিকে আছে পেটে কিল মেরে, খিদে দমন করার মত কোটি কোটি খেটে খাওয়া মানুষ। না এদেরকে ঠিক মানুষ বলা যায় না। মানুষের মত দেখতে ঠিকই, হাত পা মাথা সব মানুষেরই মত। কিন্তু এই মানুষ যখন কুকুরের সঙ্গে লড়ে ছোট বড় নগরের কোন ভ্যাটে সামান্য উচ্ছিষ্টের দখল নিতে, তখন সেই মানুষটি রাত দখল না দিন দখল করে? কে এর উত্তর দেবে?

শোষণ ও শোষকের বিরুদ্ধে শোষিত সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ বিদ্রোহ ভারতের ইতিহাসের এক অন্যতম উল্লেখযোগ্য উজ্জ্বল ধারা। ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে অসন্তোষের বীজ বপন ছিল প্রায় সকল শ্রেণীর ভারতবাসীর মধ্যে। কিন্তু এইসব অসন্তোষ, বিক্ষোভ ও বিদ্রোহে সবসময় অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল ভারতের আদিমতম অধিবাসীরা অর্থাৎ আদিবাসীরা ও সোনার ফসল ফলানো অগণিত কৃষক শ্রেণীর মানুষজন।এছাড়া  এসব গণবিদ্রোহ গুলিতে মুচি, মেথর, কামার, কুমোর, তন্তুবায়দের মত অগণিত খেটে খাওয়া মানুষজনের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মত।১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের আগে সংঘটিত নানা গণবিদ্রোহগুলির মধ্যে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ছিল মেদনীপুর বিদ্রোহ (১৭৬৬-১৭৮৩), ত্রিপুরা জেলার সমশের গাজীর বিদ্রোহ (১৭৬৭-১৭৬৮), চুয়াড় বিদ্রোহ (১৭৬৮-  ১৭৯৯), সন্দীপের বিদ্রোহ (১৭৬৯), সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ (১৭৬৩-১৮০০), কৃষক-তন্তুবায়গণের সংগ্রাম (১৭৭০-১৭৮০), চাকমা জাতির বিদ্রোহ (১৭৭৬-১৭৭৭), বীরভুমের গণবিদ্রোহ (১৭৮৫-১৭৮৬), বীরভূম-বাঁকুড়ার পাহাড়িয়া বিদ্রোহ (১৭৮৯-৯১), ১৮১৯-এর ভিল বিদ্রোহ, ১৮২১ -এর হো বিদ্রোহ, কোল বিদ্রোহ (১৮৩১-১৮৩৩), সাঁওতাল বিদ্রোহ(১৮৫৫-১৮৫৬) ইত্যাদি ইত্যাদি। সিপাহী বিদ্রোহের পরে নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-৬০), মুন্ডা বিদ্রোহ (১৮৯৯-১৯০০)ইত্যাদি।

মেহনতকারী মানুষজন শোষণ ও বঞ্চনা কখনও মেনে নেয়নি।ক্ষমতার সঙ্গে আপোষ করেনি। রক্তের বিনিময়ে লড়েছেন এবং আজও লড়ছেন, লড়ার  ক্ষমতা রাখেন বরাবরই। আজ শোষণের ও শাসকের ধরণ পাল্টেছে। হিংসা ও লুঠের মাত্রা তীব্রতার সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। লড়াই আরও কঠিন হয়েছে।কারণ শোষকদের দালাল-বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর ক্ষমাহীন বেইমানি। এদের কাজ হল দিনকে রাত আর রাতকে দিন করা আর সাধারণ মানুষকে ভুল বোঝানো নানা জটিল শব্দের ও দুরুহ বাক্যবিন্যাসে। শোষকদের আশ্রিত মাথা খাটানোর তাত্ত্বিকদের কাজ হল নানা জটিল তর্কের মাধ্যমে গতর খাটা মানুষদের বিভ্রান্ত করে শ্রমের শোষণকে স্বাভাবিক বলে প্রমাণ করা। আলোর পথে বাঁধা এই দালাল-পণ্ডিতদের নির্বাসনে পাঠানো দরকার। এবং তা অসম্ভব নয়। শুধু দরকার সাধারণ মানুষের সেই শিক্ষা যে শিক্ষা আনে চেতনা।                 

মেহনতি মানুষের মুক্তি নিশ্চয় একদিন আসবে।সব ধরণের শোষণ শেষ হবে একদিন।এ স্বপ্ন আমরা দেখি। শুধু দেখি না, একে বাস্তবে কার্যকর করতে ‘ভিন্নকথা’ তার সাধ্যমত প্রয়াস চালিয়ে যাবে। মানুষকে সঙ্গে নিয়ে, মানুষের চেতনার লক্ষে, মুক্তির লক্ষে।                       

যাই হোক, ‘ভিন্নকথা’-য় থাকছে কবিতা গল্প প্রবন্ধ বইকথা মতামত ও স্বরণে।থাকছে প্রান্তিক মানুষের কথা। থাকছে মেহনতি মানুষের কথা।লেখার গুণগত মান নিয়ে আমরা সচেতন ঠিকই। কিন্তু সাথে সাথে লেখার বিষয় নিয়ে আমরা বেশি যত্নশীল। অন্য কথায়, শিল্পের জন্য শিল্প নয়। শিল্প সাধারণ মানুষের জন্য।সাহিত্য কোন শখের কাজ নয়।এটি হতে পারে না। সাহিত্য আমাদের জীবনের রসদ দেবে। আমাদেরকে নতুন করে বাঁচতে শেখাবে, নতুন আলো আনবে মানুষের মুক্তির লক্ষে।  

আমাদের অনেকের অনেকদিনের লক্ষ্য ছিল শুধু অনলাইন নয়।অনলাইনে প্রকাশিত কিছু নির্বাচিত লেখা নিয়ে বছরে আমরা একটি করে প্রিন্ট ভার্সন করব। নানা কারণে সেটি হয়ে ওঠেনি। আজ তা বাস্তাবায়িত হচ্ছে দেখে আমরা খুশি। পাঠকদের জানাই ‘ভিন্নকথা’র সংকলনের প্রথম খণ্ড প্রকাশ করে দ্বিতীয় খণ্ডের কাজ শুরু হবে এবং  সেটি ইংরেজি চলতি বছরেই প্রকাশিত হবে বলে আশা।

প্রান্তিক মানুষদের জীবনসংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আপনাদের সমর্থন ও সহযোগিতা আমাদের পথ চলতে সাহায্য করবে।এই উদ্যোগে সহমত, দ্বিমত বা ভিন্নমত থাকলে তা অবশ্যই জানাবেন এই ঠিকানায়, editor@vinnokatha.in।আর উপরোক্ত মেলে লেখা পাঠানোর অনুরোধ রইল।   

সংকলনের কাজে শুধু আমরা এই কয়জনই নয়। আছে আরও অনেক অনেক মানুষ।আছেন আমাদের ঘরের  মা, বো্‌ন, ভা্‌ই, বউ, অভিভাবক, বন্ধু-বান্ধবদের ত্যাগ ও সমর্থন। তাঁদের নাম এখানে আলাদাভাবে নেওয়া হচ্ছে না। কারণ আমরা ব্যক্তি ও বক্তব্যে নয়, যৌথ কাজে, যৌথ দায়বদ্ধতায় বিশ্বাসী।         

সম্পাদকমণ্ডলী