আজ হতে তিরিশ বছর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ খতমের পর সারা দুনিয়া যখন বিজয়োৎসব পালন করছিল, ইংরেজি খবরের কাগজ, ম্যাগাজিনগুলিতে এই তর্কাতর্কি চালু ছিল যে এই প্রাণহানি, রক্তারক্তির জন্য দায়ী কে? লেখক সমাজ নাকি রাজনীতিকেরা। একদল লেখকদের খুব সমালোচনা করেন আর বলেন, এই হরকতের আর অশান্তির জন্য দায়ী হল লেখক সমাজ। তাঁদের দলিলগুলি অনেকটা এই রকম যে, উনিশ শতাব্দীর শেষ দিকে লেখকগণ বড্ড বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গিয়েছিলেন আর হররোজ নিত্য-নতুন তত্ত্ব-তলাশে লেগেছিলেন। এই লেখক সমাজ কর্মমুখর জীবনের বদলে কর্মবিমুখতাকে প্রাধান্য দিলেন, সাহিত্য আর কবিতাকে জনজীবন থেকে বাদ দিয়ে, তার সম্পর্ক হীনতার ঘোষণা দিয়ে, সাহিত্য ও কবিতার একটি স্বাধীন সত্তার ঘোষণা দিলেন। এই মানুষেরা অতীতকে আঁকড়ে ধরলেন আর অতীতের গৌরবগাঁথার ঝোঁককে বাড়িয়ে তুললেন।
এদের মধ্যে থেকে আরেকদল এমন ছিলেন যাদের মধ্যে ফ্রান্সের কবি বোদলেয়ারের নাম খুব বিখ্যাত, যিনি গনতন্ত্রতের বিরুদ্ধেও স্বর উঠাতে শুরু করেছিলেন। তাঁর এই সব খেয়াল আর ঝোঁক যেহেতু বিশ শতকে ঐতিহ্য হিসাবে পাওয়া গেল এবং জন-সাধারনের শিরা-উপশিরাই ছড়িয়ে পড়ল, রাজনীতিকেরা বাধ্য হয়ে গেলেন আর একনায়কতন্ত্রের দিকে ঝোঁক বাড়তে শুরু করল। ফ্যাসিবাদ, নাৎসিবাদ, হিটলার, মুসলিনি এসবেরই ফসল। এই দলের বিরুদ্ধবাদীরা বলতে শুরু করলেন, আমাদের এই অবনতির, অশান্তির মুল কারণ হল যে রাজনীতিকেরা মানে যারা ডিসিশন মেকিংএর জায়গায় রয়েছেন তাঁরা লেখাপড়ার শখকে একদম ছেড়ে দিয়েছেন। যদি রাজনীতিকেরা মার্সেল প্রুস্ত, জেমস জয়েস আর কাফকাকেই পড়ে নিতেন, তবে তাঁরা সহজেই বুঝে যেতেন যে ইউরোপর এই অশান্তির আসল কারণ কি। আর যেহেতু ক্ষমতা তাঁদের হাতে ছিল, তাঁরা ইউরোপকে এই ধ্বংস হতে বাঁচানোর বন্দোবস্ত করতে পারতেন। যদি আমরা দেখতে পেতাম যে, চার্চিল তাঁর ভাষণে দান্তের ইনফারনো, বা ইলিওটের ওয়েস্টল্যান্ডের দ্বিতীয় ভাগের কথা স্মরণ করছেন, তাহলে আমার বলতে পারতাম যে তিনি হকিকতের কাছাকাছি চলে এসেছেন। আর এই দূরদৃষ্টি হতে তাঁর মধ্যে এক গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা তৈরি হত। কিন্তু যেহেতু এমন হলনা, তাই এই পরিস্থিতিতে যা হওয়ার তাই হল, মানে যুদ্ধ, অশান্তি আর মনোজগতের দৈন্যতা।
তবে যাই হোক, দায়িত্বের ব্যাপারে তো আপনি ভাবতে থাকেন; আমি তো এই কথা বলতে চাই যে কোন সমাজ কে জিন্দা আর সচল রাখতে চাইলে এটা জরুরী যে তার চিন্তা ভাবনা আর কাজকর্মের মধ্যে যেন একটি গভীর সম্পর্ক আর যোগাযোগ থাকে। যখন ভাবনা আর কাজ একটি আরেকটি হতে আলাদা হয়ে যায় তখন রাজনীতিতে বন্য আইন-কানুন শুরু হয়ে যায়। আর ভাবনাচিন্তার লতাপাতা শুকিয়ে যায়। প্রাচ্যের বেশিরভাগ সমাজই আজ এই রোগে আক্রান্ত। এখনকার রাজনীতিকেরা চিন্তা-ভাবনা করার রেওয়াজ না থাকার কারণে নিজেদের নাকের ডগার অগ্রভাগ থেকে দুরে দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। তাঁদের কাছে পড়াশুনা করা তো এই অর্থে অর্থহীন হয়ে গিয়েছে যে এই প্রয়োজন তো ভাবনা-চিন্তার কারণে পয়দা হয়।
আর থাকল লেখক সম্প্রদায় তাঁরা ভাবনার অর্থহীনতার আর ভাবনার প্রয়াস থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার জন্য হয় গতানুগতিক ভাবে ঢোল বাজাচ্ছেন নতুবা নতুনত্বের সন্ধানে পশ্চিমের নতুন নতুন আন্দোলন আর কর্মপন্থার নকলকে আমদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার এক নাকাম চেষ্টা করে চলেছেন। আর এ জন্যই সাহিত্যও জীবনের আর পাঁচটি জরুরী ও গুরত্বপূর্ণ কাজের মতোই বেকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৃজনশীল চিন্তা জগতে কেবল নকল করে না কোনও কাজ হয়েছে না হবে। অন্যের নকল হয়ত কিছুক্ষণের জন্য আপনার কাজ তো করে দেবে তবে তা আপনার অন্তরের অন্তঃস্থলে প্রবেশ করতে পারবে না। আর যে জিনিস আপনার আত্মাই প্রবিষ্ট না হয় তা আপনার সৃষ্টিশীল কাজগুলিকেও উন্নীত করতে পারবে না। পুরো প্রাচ্য আজ এই অবস্থার শিকার, তার চিন্তা জগত আজকে নড়বড়ে, নিজেকে আজ পাশ্চাত্যের কাছে পরাজিত আর হীন ভাবছে ।
এটি একটি প্রাকৃতিক ব্যাপার, যখন কোন ব্যাক্তি বা সমাজ এই অবস্থার মুখোমুখি হয় তখন সে একটি চলমান সভ্যতা-সংস্কৃতির নকল অথবা তার অনুসরণ করতে শুরু করে। এই জন্যই পশ্চিমের সংস্কৃতি, তার চিন্তা ভাবনা কোন বাধা বিপত্তি প্রতিরোধ ছাড়াই আমাদের ছেয়ে ফেলছে। তাকে থামানো এখন আমদের সাধ্যেরও অতীত। হয় পশ্চিম নৌকায় বসে নতুন বাজার খুঁজতে প্রাচ্যের সীমা অতিক্রম করেছে অথবা কামান আর বন্দুকের জোরে এসেছে, বাস্তবিকতা এটাই যে সে চলে এসেছে, ছেয়ে গিয়েছে, আর পুরো প্রাচ্যের শিরা-উপশিরায় বিস্তার ঘটাচ্ছে । আর প্রাচ্য তাঁর প্রভাবে খুব দ্রুততার সাথে বদলে যাচ্ছে।
আপনি আপনার ইমারতকে দেখুন, আপনার লিবাস-পোশাক, আপনার ঘর, থালা-বাসন, আর অন্যান্য জিনিসপাতির দিকে দেখুন, আপনার সঙ্গীত, চিত্রকলা, আপনার সাহিত্য, তার রকম আর রচনা আর রচনাশৈলীর, আপনার ব্যবসা-বানিজ্যের কেন্দ্র সমূহ, আর অফিসের কর্ম পদ্ধতিগুলিকে দেখুন, আপনার যানবাহন, চিকিৎসার সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য পন্থাগুলিকে দেখুন, নিজেদের জীবন-যাপন, সংস্কৃতি, বাসস্থানের রীতিনীতি, আপনার সাহিত্য সংস্কৃতির আর সৃষ্টিশীল কাজের কেন্দ্রগুলিকে দেখুন, ঐ কামরাটির দিকে দেখুন যেটিতে আপনি ঘুমান বা কাজ করেন, আপনাকে পাশ্চাত্যের গভীর ছাপ সব দিক হতে নজরে আসবে। আরও চিত্তাকর্ষক ব্যাপার হল, চিন্তা ভাবনার ক্ষমতা আর আমল যেহেতু আমাদের এখানে একে অপর থেকে কেটে গিয়েছে, এই সব কাজ আমদের চিন্তাচেতনার অংশ না হয়েই ঘটে চলেছে।
কেউ আসে তো আসুক খাস্তা হাল দরজা নষ্ট হয়ে পড়ে আছে, ইমারতের বড় অংশ ভেঙ্গে পড়ে আছে, আর মালকিন রিফিউজি হয়ে বসে আছে। আর এখন দরজার কাছে কোন রক্ষক বা চৌকিদারও নেই, আর মালকিন ছাদ ভেঙ্গে পড়ার ভয়ে বসে আছে। ঠিক আছে এতেও কোন খারাপ কিছু ছিলনা, যদি পাশ্চাত্যকে গ্রহণ করে আমরা আমদের মাঞ্জিলে পৌঁছাতে পারতাম। কোন সংস্কৃতি বা কোন জিনিস বা ভাবধারাকে আত্তীকরণতো সজ্ঞান চেতানার অংশ কিন্তু সজ্ঞান আত্তীকরণ আর বাধ্য হয়ে মেনে নেওয়া বা অবচেতানায় আত্তীকরণ আলাদা জিনিস। এই অবস্থাই যা এখন অনেক গভীর হয়ে গিয়েছে, আমাদের ভাবনাচিন্তার ক্ষমতাকে বন্ধ করে দিয়েছে আর আমাদের সৃজনশীল ক্ষমতাকে বন্ধ্যা করে দিয়েছে। আমদের এখন আর কিছু করার দরকার নেই, কেবলমাত্র পশ্চিমের ক্যাপসুলগুলিকে গিলে নিতে হবে বাকি কাজ আপনার থেকেই হতে থাকবে।
একটি জীবন্ত সমাজ বদলায় নতুন চিন্তাভাবনা আর জিনিসপত্রকে স্বীকার করে। তবে এই সব চিন্তাভাবনা বা জিনিসগুলিকে তার নিজের যে পরিমাপের সীমা আছে তার পরিপ্রেক্ষিতে হয় গ্রহণ করে নয়ত বা রদ করে। তবে এখন যখন আমাদের পরিমাপের বাঁধ ভেঙ্গে গিয়েছে, বানের পানি আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে চলছে, আর আমরা এখন সেইখানে পৌঁছাবো, বানের পানি আমাদের যেখানে নিয়ে যাবে। আমাদের মনে থাকবে কখনও আমাদের নিজেদেরও এক অনুভূতি ছিল, তার এক নিজস্ব বিধি-ব্যাবস্থা ছিল; আর এই বিধি-ব্যাবস্থা পুরোপুরি, নৈতিক ব্যবস্থার সাথে বিধিবদ্ধ ছিল। প্রথমে আমাদের মতোই পাশ্চাত্য ব্যবস্থাও নৈতিক ভিত্তির সাথে সম্পৃক্ত ছিল। কিন্তু পাশ্চাত্য রেনেসাঁসের সময় এক নতুন রাস্তা অবলম্বন করল, সে কাজের উৎসাহে আর বিকাশের উৎসাহে সব বাঁধন ছিঁড়ে ফেলে আর লাগামহীন হয়ে সীমাহীন তদন্ত আর অনুসন্ধানের সম্পূর্ণ স্বাধীনতাকে আপন করে নেয়। এটা পশ্চিমের সচেতন সিদ্ধান্ত ছিল। সম্পূর্ণ স্বাধীনতার ধারনাকে আকাশ ছোঁয়ানোর জন্য এটা দরকার ছিল যে সে সব ধরনের বিধি ব্যাবস্থা হতে নিজেকে ছিন্ন করে নিয়ে ছিল। কেটে নিয়েছিল।
এর ফলে কি হল, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার আর নতুন নতুন পন্থার রাস্তা তো খুলে গেল কিন্তু এর সাথে ভাল আর খারাপের সব ফারাক মিটে গেল। আর এর এই ফারাক তো কেবল কোনও নৈতিক জীবনবিধির সাথে সম্পর্ক রেখেই বাকি রাখা যেত। ফলস্বরূপ ধীরে ধীরে জ্ঞান- বিজ্ঞানের এই সব আবিষ্কার এমন লোকের হাতে এসে পৌঁছাল, যার আখলাকি তালীম শূন্যের প্রায়। যখন চিন্তা-চেতনা, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার কোনো নৈতিক বিধি-ব্যাবস্থার সাথে সম্পর্ক রাখে না আর মানবজীবন আর মানবিকসম্পর্কগুলি অর্থহীন বলে মনে হয়, তখন এমন একটি ক্ষমতা সম্পন্ন মানুষের কাছে মানবজাতির ধ্বংস আর বরবাদী কেবলমাত্র একটি তামাশা ছাড়া আর কোন গুরত্ব রাখেনা। আর এখন যে বাধা রয়েছে তা কেবল শুধুমাত্র ভীতির কারণে। এটা শুধুমাত্র এই জন্য যে এমনই আরেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষের কাছেও এমনিই আবিষ্কার মজুত আছে। আর এখনতো শুধু ঐ ক্ষণটির দেরী যখন কিছুক্ষণের জন্য রাগ আর পাগলামো এই ভীতির উপর চেপে বসে।
পশ্চিমের হাল আমদের সামনে রয়েছে; আমরা দেখে নিয়েছি তিন চারশো বছরের ব্যাবধানে কোথা হতে শুরু করে কোথায় পৌঁছেছে । আমরা এটাও দেখে নিয়েছি, চিন্তা-ভাবনার স্বাধীনতাকে নৈতিক বিধিব্যবস্থা হতে বাদ দিয়ে পশ্চিম উদ্দেশ্যকে তার আসল হতে কেটে দিয়েছে। কর্মকে শিকড় ছাড়া করে দিয়েছে, ভিত্তিকে তার চেতনা থেকে, ব্যাক্তিকে তার সমাজ থেকে, ধর্মকে নৈতিকতা থেকে, সাহিত্যকে কল্পনা থেকে, দৃষ্টিভঙ্গিকে কে অভিজ্ঞতা থেকে কেটে দিয়েছে।
তাহলে এই অবস্থায় আমাদের প্রাচ্যবাসীদের কি অবস্থা হবে? আর এই ঝড় আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে?
এই সময়ে চিন্তার জগতের হিসাবে আমাদের এই বিশ শতক খসে পড়ছে, উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে জন্ম নেওয়া যে সব মতবাদ বিশ শতকের মূল হয়েছিল তা এখন সফরের শেষ গন্তব্যে পৌঁছে আরও ভেঙে ছড়িয়ে পড়ার মুখে। এই সময় আমাদের প্রাচ্যের আর আমাদের সমাজের খবর নেয়া উচিৎ। এটাই এখন পুরো প্রাচ্যের সব চেয়ে বড় সমস্যা। এই কথাগুলো আমার মতো আপনারাও অব্যশই জানেন। প্রথমে চিন্তা-জগতে পরিবর্তন হয়। তারপরে উত্তরণের মঞ্জিল আসে; মানে সেই অবস্থা যখন চিন্তা-জগতের পরিবর্তন হৃদয় কে কাবু করে ফেলে। তারপরে আসে আমলের বা কর্মের মঞ্জিল যেখানে উত্তরণ আর কর্ম মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এই অবস্থাই যার কথা আমি সংক্ষেপে আপনাদের সামনে উল্লেখ করলাম, আমাদের সব চেয়ে বড় বিষয় হল ভাবনা-চিন্তার জগতের নবরূপে বিন্যাস। এটা একা বা একজনের কাজ নয়, বরং এটা সকলের কাজ। আসুন আমরা এই কাজটি শুরু তো করি।
জামিল জালিবি: (১২ জুন, ১৯২৯- ১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ) : জন্ম ব্রিটিশ ভারতের উত্তর প্রদেশের আলিগড় শহরে। তাঁর আসল নাম ছিল মুহাম্মাদ জামিল খাঁন। মিরাট কলেজে পড়ার সময় দেশভাগের কালে পাকিস্তানে চলে যান। সিন্ধু ইউনিভার্সিটি থেকে থেকে ১৯৭১ সালে PhD আর ১৯৭৩ সালে D.litt । কর্ম জীবনের শুরু একজন স্কুল হেডমাস্টার হিসাবে এবং পরবর্তীতে করাচী ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যানসেলর। বিভিন্ন উর্দু ম্যাগাজিনের এডিটর হিসাবেও কাজ করেছেন। তাঁর লিখিত বইয়ের সংখ্যা চল্লিশ, ছোটদের জন্যও লিখেছেন।মৃত্যুর পূর্বে তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহের প্রায় দশহাজার বই তিনি করাচী ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিতে দান করেন।
