সম্পদের চূড়া, ক্ষুধার অতল গভীরতা —কোন পথে মানবসভ্যতা?

বিশ্ব ইতিহাসে সম্পদের এমন বিকৃত, পরস্পরবিরোধী ও বীভৎস চিত্র সম্ভবত আগে কখনও এত তীব্রভাবে দেখা যায়নি, যতটা আজ দেখা যাচ্ছে। একদিকে, হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তি এক বছরে এমন সম্পদ সঞ্চয় করছেন যা বহু দেশের বার্ষিক জাতীয় আয়ের সমান কিংবা তারও বেশি। অন্যদিকে, বিশ্বের প্রতি চারজনের একজন আধা-পেট খেয়ে ঘুমাতে যায়।

ডাভোসে অনুষ্ঠিত World Economic Forum-এর প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত Oxfam International-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদন “Resisting the Rule of the Rich: Protecting Freedom from Billionaire Power” বৈশ্বিক বৈষম্যের এক গভীরভাবে উদ্বেগজনক ও অস্বস্তিকর চিত্র তুলে ধরেছে।

প্রতিবেদনের পরিসংখ্যানগুলো স্তম্ভিত করে দেওয়ার মতো। ২০২৫ সালে বিশ্বের বিলিয়নিয়ারদের মোট সম্পদ পৌঁছেছে নজিরবিহীন ১৮.৩ ট্রিলিয়ন ডলারে—যা আগের বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি। মাত্র এক বছরে এই অতিধনী শ্রেণি তাদের সম্পদে যোগ করেছে প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার—যা পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র ৩.৮৩ বিলিয়ন মানুষের সম্মিলিত সম্পদের চেয়েও বেশি। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ৩,০০০ অতিক্রম করেছে, এবং তাদের মোট সম্পদ সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২০ সালের পর থেকে তাদের সম্পদ বেড়েছে ৮১ শতাংশ, অথচ বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা হয় স্থবির থেকেছে, নয়তো আরও অবনতি ঘটেছে।

এই বৈষম্যের ব্যাপ্তি উপলব্ধি করতে একটি তুলনাই যথেষ্ট: এক বছরে যে পরিমাণ সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে, তা দিয়ে বৈশ্বিক চরম দারিদ্র্য ২৬ বার নির্মূল করা সম্ভব। যথাযথভাবে ব্যবহার করা হলে এই সম্পদ দিয়ে বিশ্ব থেকে চরম দারিদ্র্য একবার নয়, ছাব্বিশবার দূর করা যেত। তবু এমন রূপান্তর অসম্ভাব্য বলেই মনে হয়, কারণ বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ও সম্পদ ক্রমাগত বাড়ছে, আর দারিদ্র্য বিমোচনের গতি যাচ্ছে উল্টো দিকে।

এই বিশাল সম্পদ-পিরামিডের শীর্ষে অবস্থান করছেন Elon Musk, যার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে—প্রায় ৫০২ বিলিয়ন ডলার। ইতিহাসে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি এমন উচ্চতায় পৌঁছেছেন। এই সংখ্যাগুলো বিমূর্ত মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তব জীবনে এর তাৎপর্য বিস্ময়কর। বিশ্বের ১১৭টি দেশের সম্মিলিত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) চেয়েও তার ব্যক্তিগত সম্পদ বেশি।

নভেম্বর ২০২৪-এ Donald Trump পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর বিলিয়নিয়ারদের সম্পদ বৃদ্ধির হার আগের পাঁচ বছরের তুলনায় তিনগুণ দ্রুত হয়েছে বলে জানা যায়। অতিধনীদের করছাড়, আন্তর্জাতিক কর কাঠামো দুর্বল করা, অ্যান্টি-মনোপলি আইন শিথিল করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগে জোরালো প্রণোদনা—এসব নীতিই সম্পদ কেন্দ্রীভবনকে ত্বরান্বিত করেছে। এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি; যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিলিয়নিয়ার সম্পদও দ্বিগুণ অঙ্কের হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে অর্থনৈতিক বৈষম্য এই সংকটের কেবল একটি মাত্রা। আরও গভীর ও বিপজ্জনক দিক হলো বিলিয়নিয়ারদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাব। অক্সফামের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ নাগরিকের তুলনায় বিলিয়নিয়ারদের রাজনৈতিক পদে পৌঁছানোর সম্ভাবনা ৪,০০০ গুণ বেশি। এই পরিসংখ্যান গণতন্ত্রের সেই মৌলিক নীতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের কণ্ঠ সমান হওয়ার কথা। বাস্তবে, সম্পদ রাজনৈতিক শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে।

World Values Survey-এর অধীনে ৬৬টি দেশে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক উত্তরদাতা বিশ্বাস করেন যে তাদের দেশে ধনী ব্যক্তিরা নির্বাচন কিনে নেয়। নির্বাচনী অর্থায়ন, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে বিলিয়নিয়াররা গণতন্ত্রকে ভিতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে। যেমন বলা হয়—অর্থনৈতিক দারিদ্র্য ক্ষুধা জন্ম দেয়, আর রাজনৈতিক দারিদ্র্য জন্ম দেয় ক্ষোভ। সেই ক্ষোভ এখন বিশ্বজুড়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনের বিস্ফোরণে রূপ নিচ্ছে।

২০২৪ সালে টানা উনিশতম বছরের মতো বিশ্বব্যাপী নাগরিক স্বাধীনতা হ্রাস পেয়েছে। এক-চতুর্থাংশ দেশ মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ৬৮টি দেশে ১৪২টিরও বেশি বড় সরকারবিরোধী আন্দোলন নথিভুক্ত হয়েছে, যার অনেকগুলো সহিংসভাবে দমন করা হয়েছে। গবেষণা বলছে, উচ্চ বৈষম্যপূর্ণ দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ের সম্ভাবনা সাতগুণ বেশি। বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি গণতন্ত্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি।

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে যারা গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে, তারাই নির্ধারণ করে মানুষের উপলব্ধ ‘সত্য’। আজ বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি প্রধান গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বিলিয়নিয়ারদের মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রিত। Jeff Bezos মালিকানাধীন The Washington Post। Elon Musk অধিগ্রহণ করেছেন Twitter (বর্তমানে X)। Patrick Soon-Shiong কিনেছেন Los Angeles Times। ফ্রান্সে Vincent Bolloré CNews-কে এমনভাবে রূপান্তর করেছেন, যাকে সমালোচকেরা “ফ্রান্সের ফক্স নিউজ” বলে অভিহিত করেন।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাস্কের অধিগ্রহণের পর X-এ ঘৃণাত্মক বক্তব্য প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যা একসময় উন্মুক্ত সংলাপের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হতো, তা এখন অনেকের চোখে মালিকের মতাদর্শ প্রতিফলিত করার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কেনিয়ায় কর্মকর্তারা সমালোচকদের নজরদারি ও দমনে X ব্যবহার করেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

বৈষম্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত আরেকটি নীরব সংকট হলো ভূমি অবক্ষয়। Food and Agriculture Organization-এর  “The State of Food and Agriculture 2025”  প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১.৭ বিলিয়ন মানুষ এমন এলাকায় বাস করে যেখানে মানবসৃষ্ট ভূমি অবক্ষয় কৃষি উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বব্যাপী গড় ফসল উৎপাদন প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে, এবং অপুষ্টির কারণে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪৭ মিলিয়ন শিশু খর্বাকৃতির শিকার। অবক্ষয়গ্রস্ত কৃষিজমির মাত্র ১০ শতাংশ পুনরুদ্ধার করা গেলে বছরে অতিরিক্ত ১৫৪ মিলিয়ন মানুষের খাদ্য জোগান দেওয়া সম্ভব।

২০২৫ সালে বিশ্বে ২৯৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ তীব্র ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষসদৃশ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্ষুধা এক বিপজ্জনক জোট গড়ে তুলেছে। গবেষণা বলছে, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে প্রায় ১.১৬ বিলিয়ন মানুষ অন্তত একবার গুরুতর খাদ্যসংকটের মুখে পড়তে পারে, যার মধ্যে ৬০০ মিলিয়নেরও বেশি শিশু থাকবে। তবে টেকসই উন্নয়ন ও সময়োপযোগী নির্গমন হ্রাস প্রায় ৭৮০ মিলিয়ন মানুষকে এমন সংকট থেকে রক্ষা করতে পারে।

আফ্রিকায় চরম দারিদ্র্য আবারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৈশ্বিক সহায়তায় বাজেট কাটছাঁট স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পুষ্টি কর্মসূচিকে হুমকির মুখে ফেলেছে, যার ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ১৪ মিলিয়ন মৃত্যু ঘটতে পারে। এসব মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য—যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে।

খাদ্য নিরাপত্তা কেবল বেশি শস্য উৎপাদনের প্রশ্ন নয়। বিশ্ব ইতোমধ্যেই পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন করে; সমস্যা হলো বণ্টন, ক্রয়ক্ষমতা, সংরক্ষণ ও সুশাসনে। শক্তিশালী স্থানীয় কৃষি ব্যবস্থা, পানি সংরক্ষণ, ফসলের বৈচিত্র্য এবং সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ—এই চারটি স্তম্ভই প্রকৃত খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি।

ভারতে কৃষক আত্মহত্যা, কম ফসলমূল্য, জলের সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অনিয়মিত বৃষ্টিপাত বৈশ্বিক খাদ্য সংকটেরই প্রতিফলন। প্রায় ৫৫০–৬০০ মিলিয়ন মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল হলেও জিডিপিতে এর অবদান মাত্র ১৫–১৭ শতাংশ—যা দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অসামঞ্জস্য।

সমাধান নাগালের বাইরে নয়। অক্সফামসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সময়সীমাবদ্ধ বৈষম্য হ্রাস পরিকল্পনা, অতিধনীদের ওপর কার্যকর কর, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষা এবং নাগরিক অধিকারের রক্ষার সুপারিশ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দ্রুত নির্গমন হ্রাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের নীতি—যেখানে দূষণের জন্য দায়ী দেশগুলো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেবে—অপরিহার্য।

একদিকে ইলন মাস্ক অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ সঞ্চয় করছেন; অন্যদিকে শিশু না খেয়ে ঘুমায়। এটি নিয়তি নয়—এটি মানুষের সিদ্ধান্তের ফল। আর মানুষ যা সৃষ্টি করে, মানুষ তা পরিবর্তনও করতে পারে।

খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু ন্যায়বিচার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক সমতা—এসব পরস্পর গভীরভাবে সংযুক্ত চ্যালেঞ্জ। এগুলোর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও সাহসী বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া। মানবসভ্যতা চাঁদে পৌঁছেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উদ্ভাবন করেছে, মহাকাশে উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করেছে—তবু কেন প্রতিটি শিশুকে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পেট ভরে খাওয়ানো এত কঠিন?

উত্তর সামর্থ্যের অভাবে নয়; উত্তর রাজনৈতিক সদিচ্ছায়। আর সেই সদিচ্ছা জাগ্রত করাই আমাদের প্রজন্মের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

You may also like