বিকাশ পরাশ্রম মেশরাম
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তিটি সারা দেশে তীব্র বিতর্কের সূচনা করেছে। এই চুক্তিটি কেবল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের একটি উদ্যোগ নয়; এটি সরাসরি ভারতীয় কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA)-র ধারণা উপরে উপরে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক অর্থনীতি ও সামাজিক পরিণতি প্রায়ই অসম ও বিতর্কিত। আবারও সেই মৌলিক প্রশ্নটি সামনে এসেছে: এই চুক্তি থেকে কারা উপকৃত হবে, এবং এর মূল্য কারা পরিশোধ করবে?
চুক্তির খসড়া প্রকাশের পর একাধিক কৃষক সংগঠন গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশব্যাপী আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কৃষকদের আশঙ্কা কেবল সয়াবিন তেল, শস্য বা আপেলের ওপর শুল্ক ছাড় সংক্রান্ত নয়। এই উদ্বেগ মূলত বিশ্বাস, স্বচ্ছতা এবং ভারতীয় কৃষির ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে। সরকার বারবার আশ্বাস দিচ্ছে যে কৃষি ও দুগ্ধ খাত সুরক্ষিত থাকবে, কিন্তু চুক্তিতে বিভিন্ন কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্যের ওপর শুল্ক হ্রাস এবং অশুল্ক বাধা অপসারণের বিধান থাকায় কৃষকদের উৎকণ্ঠা বেড়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে পূর্ববর্তী মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলি সস্তা আমদানির প্রবাহ বাড়িয়েছিল, যা স্থানীয় উৎপাদকদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। ঐতিহাসিকভাবে, FTA-গুলি বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) প্রতিষ্ঠার পর শুল্ক হ্রাস, বাজার উন্মুক্তকরণ এবং বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা বৈশ্বিক নীতিতে পরিণত হয়েছে। তবে গ্লোবাল সাউথের বহু দেশের অভিজ্ঞতা দেখায় যে FTA-গুলি প্রায়শই বহুজাতিক কর্পোরেশন, রপ্তানিকারক এবং উন্নত অর্থনীতিকে সুবিধা দেয়, যেখানে ক্ষুদ্র কৃষক, স্থানীয় শিল্প ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকরা ক্ষতির মুখে পড়ে। FAO ও UNCTAD-এর গবেষণা অনুযায়ী, কৃষি বাজার উদারীকরণের পর বহু উন্নয়নশীল দেশে গ্রামীণ আয় বৈষম্য বেড়েছে এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের আয় স্থবির বা হ্রাস পেয়েছে।
আপেল শিল্প একটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর এবং উত্তরাখণ্ডে আপেল শুধু একটি ফসল নয়, বরং সমগ্র পার্বত্য অর্থনীতির মেরুদণ্ড। যদি মার্কিন আপেলের ওপর আমদানি শুল্ক হ্রাস করা হয় এবং ন্যূনতম আমদানি মূল্য বাড়ানো হয়, তবে মার্কিন আপেল প্রিমিয়াম ভারতীয় আপেলের সমান দামে ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করবে। এর ফলে ভোক্তারা একই দামে উচ্চতর গুণমানের ধারণার কারণে আমদানিকৃত আপেল পছন্দ করতে পারেন, যা স্থানীয় উৎপাদকদের বাজার অংশ হ্রাস করবে। ঠান্ডা গুদামে আপেল সংরক্ষণ আর লাভজনক নাও থাকতে পারে, এবং স্থানীয় শিল্প মারাত্মক সংকটের মুখে পড়তে পারে।
সয়াবিন ও শস্যের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি বিদ্যমান। ভারতে সয়াবিন উৎপাদন মূলত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের দ্বারা পরিচালিত হয়। গড়ে ভারতে এক একর জমিতে প্রায় ১ মেট্রিক টন সয়াবিন উৎপাদিত হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে জিনগতভাবে পরিবর্তিত সয়াবিন জাত এক একরে ৩ মেট্রিক টন পর্যন্ত ফলন দিতে পারে। এই উৎপাদনশীলতার ব্যবধান ভারতীয় কৃষকদের জন্য অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে। তদুপরি, মার্কিন কৃষকরা ব্যাপক সরকারি ভর্তুকি পান। গড়ে একজন মার্কিন কৃষক বছরে প্রায় ৬৬,০০০ মার্কিন ডলার ভর্তুকি পান, এবং ২০২৬ সালের জন্য ১২ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি প্রস্তাব করা হয়েছে। বিপরীতে, ভারতীয় কৃষকরা সীমিত সহায়তা পান এবং প্রায়ই ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (MSP)-এর তুলনায় ৩০–৪০ শতাংশ কম দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হন। এই পরিস্থিতিতে মুক্ত বাণিজ্য একটি অসম মাঠে খেলার মতো।
এই চুক্তিটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে, এবং সেখানে কৃষি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ক্ষেত্র। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ মার্কিন কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং রপ্তানি বাজার সংকুচিত করেছে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন বাজারের প্রয়োজন রয়েছে। ১৪০ কোটির জনসংখ্যা নিয়ে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বিশাল বাজার। তাই ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গ্রামীণ অসন্তোষ কমানো এবং কৃষক লবিকে সন্তুষ্ট করা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই চুক্তির অন্যতম গুরুতর দিক হলো স্বচ্ছতার অভাব। কৃষক সংগঠন, বিরোধী দল এবং একাধিক রাজ্য সরকার দাবি করেছে যে চুক্তির পূর্ণ বিবরণ সংসদের সামনে উপস্থাপন করা হোক। বাণিজ্য চুক্তির প্রভাব দেশীয় আইনের মতোই গভীর, কারণ এগুলি লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা প্রভাবিত করে। তাই সংসদীয় বিতর্ক, জনপরামর্শ এবং প্রভাব মূল্যায়ন অপরিহার্য। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছাড়া বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করলে জনবিশ্বাস ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়।
ভারতীয় কৃষি ইতিমধ্যেই বহু সংকটে জর্জরিত—ঋণগ্রস্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজার অস্থিরতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা। OECD-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ভারতীয় কৃষকরা প্রায় ১১১ লক্ষ কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। যদি সস্তা আমদানিকৃত পণ্য বাজারে ভরে যায়, তবে দেশীয় বাজার ভেঙে পড়তে পারে। অতীতে তুলা আমদানির ওপর শুল্ক হ্রাসের ফলে দেশীয় দাম পড়ে গিয়ে কৃষকদের বড় ক্ষতি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, খাদ্য আমদানি গ্রামীণ কর্মসংস্থান কমায় এবং বেকারত্ব বাড়ায়। ভারতে কৃষি শুধু একটি অর্থনৈতিক খাত নয়; এটি গ্রামীণ কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস, সামাজিক স্থিতিশীলতার স্তম্ভ এবং খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি। বিশ্বব্যাংকের (২০২৩) তথ্য অনুযায়ী, ভারতের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল।
ভারতীয় ও মার্কিন কৃষকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য ভর্তুকি ও পরিকাঠামোতে। OECD-এর প্রডিউসার সাপোর্ট এস্টিমেট (PSE) রিপোর্ট অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র কৃষি উৎপাদনে ব্যাপক সরকারি সহায়তা প্রদান করে। ২০২০ সালের অ্যাগ্রিকালচারাল রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সার্ভে অনুযায়ী, একজন মার্কিন কৃষক গড়ে বছরে ৬৬,৩১৪ ডলার ভর্তুকি পান। এছাড়া ২০২৬ সালের জন্য “ফার্মার্স ব্রিজ অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম”-এর আওতায় অতিরিক্ত ১২ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা ঘোষণা করা হয়েছে। এই সহায়তা মার্কিন কৃষকদের বাজারের ওঠানামা থেকে রক্ষা করে এবং কম দামে পণ্য বিক্রি করতে সক্ষম করে। বিপরীতে, ভারতীয় কৃষকরা সীমিত ভর্তুকি, অপর্যাপ্ত সেচ ব্যবস্থা, দুর্বল সংরক্ষণ অবকাঠামো এবং বাজার অনিশ্চয়তার মুখোমুখি।
এই চুক্তি জিনগতভাবে পরিবর্তিত (GM) ফসল নিয়েও গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। মার্কিন কৃষি ব্যাপকভাবে GM ফসলের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে ভারতে সামাজিক, পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত কারণে GM ফসল নিয়ে আপত্তি রয়েছে। মুক্ত বাণিজ্যের মাধ্যমে যদি GM খাদ্যপণ্যের প্রবেশ সহজ হয়, তবে তা খাদ্য সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করতে পারে। খাদ্য সার্বভৌমত্ব বলতে একটি দেশের নিজস্ব খাদ্য ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের অধিকারকে বোঝায়।
বৈশ্বিকভাবে, এই চুক্তিকে একটি নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য নীতি চাপ ও ক্ষমতার রাজনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা বহু বিশ্লেষকের মতে WTO-এর নিয়মকে দুর্বল করে। শক্তিশালী দেশগুলির চাপের মুখে দুর্বল দেশগুলি নিয়ম মানতে বাধ্য হলে একটি বিপজ্জনক বৈশ্বিক প্রবণতা তৈরি হয়। ভারতকে মুক্ত বাণিজ্যে যুক্ত হলেও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে হবে; নচেৎ কৃষি বাজার বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক কৌশলের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
শেষ পর্যন্ত, ভারত–মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি পারস্পরিকভাবে লাভজনক হবে নাকি একটি অসম চুক্তিতে পরিণত হবে, তা নির্ভর করবে এর চূড়ান্ত শর্তের ওপর। যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা, ভর্তুকি সংস্কার, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাজার সুরক্ষা থাকলে মুক্ত বাণিজ্য একটি সুযোগে পরিণত হতে পারে। কিন্তু স্থানীয় কৃষকদের সুরক্ষা ছাড়া যদি বাজার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করা হয়, তবে এই চুক্তি গ্রামীণ ভারতের জন্য একটি ঐতিহাসিক হুমকিতে রূপ নিতে পারে। কৃষি কেবল একটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্র নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র এবং জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তি। তাই যে কোনো বাণিজ্য চুক্তি সংখ্যার হিসাব নয়, কৃষকের জীবনের ওপর ভিত্তি করেই মূল্যায়িত হওয়া উচিত।
(মূল ইংরেজি প্রবন্ধটি Countercurrents-এ প্রকাশিত)
