একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু

by জয়দেব গান

বাবা তুই নকি চাখরি পালি?
– ধ্যুর কে বল্ল্য তকে চাখরি পালি,
-পুটুরা বলছিল তোর বাবা চাখরি পাল্যেক রুখনীর কারখানাটোতে।

শীতের রাত। বৃত্তাকারে আগুনের পাশে বসে থাকা,ভাই ও বাবা-মার আলো পড়া মুখ গুলির অব্যক্ত ভাষাকে, উদ্ধার করতে অক্ষম হয় রুবু। কারখানা থেকে সদ্য প্রাপ্ত বাবার লাল টুপি আর জুতো জোড়া,পাঁচিলের গায়ে ঝুলতে দেখে সে এক অপূর্ব আনন্দ অনুভব করে! সে বুঝতে পারে তাদের এবার বড়লোক হওয়ার দিন গুলি এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে; কাল ভোর হলেই তার শুভ সূচনা। তাদের এই ছেঁড়া বাবুই দড়ির খাট, ভাঙ্গা আয়নায় টুকরো মুখের ছবি আর ভিজে দেওয়ালকে ভয় করে দেখতে হবে না। ঝিনুকের খোলা থেকে জন্ম নেওয়া মুক্তোর মতো, এখানেও সুন্দর এক বাড়ির জন্ম হবে! দীনুবাবুদের বাগানের মতো তাদের বারান্দাতেও দোল খাবে বহু রকমের গোলাপ, গাঁদার চারা। রাতের গভীরতা যতই বাড়তে থাকে, ততই তার রঙ্গিন স্বপ্নগুলো আরও প্রকট হয়!

পরদিন ভোর হতে না হতেই দেখা যায়, প্রফুল্ল মনে রুবুর বাবা তার মরচে পড়া সাইকেলে চেপে, পাড়ি দেয় রুকনীর স্পঞ্জ আয়রন কারখানার দিকে। দরিদ্রতায় কাবু হয়ে যাওয়া ভারাক্রান্ত কর্মহীন জীবন আজ নতুন দিশা পেয়ে কত যে বিচিত্র নতুন গানের কলি, ছন্দ, লয়, উঠানামা করছে তার মনের তরঙ্গে, তা সে নিজেই বুঝে উঠতে পারে না! তার মন জুড়ে শুধু বিরাজ করছে এক নতুন রোমান্টিকতা!

কারখানার একেবারে সামনে অর্থাৎ গেটের গোড়ায় পৌঁছে দেখতে পায়, প্রায় জনা পঞ্চাশেক লোক জটলা বেঁধে কেমন যেন হল্লা করছে।গেটের সিকিউরিটি গার্ড সান্ত্বনার সুরে কি যেন বলছে, তার মিনমিনে গলায়। রুবুর বাবা ব্যাপারখানা ঠিক বুঝতে না পেরে সে প্রায় অবাক চোখে চারপাশে তাকাতে থাকে। বোঝার চেষ্টা করে হল্লার আসল কারণ। গন্ডগোলটি থেকে দূরে নিরাপদে দাঁড়িয়ে থাকা মুন্সীকে সে দেখতে পায়; ভয় মিশ্রিত চলার গতিতে সে এগিয়ে যায় মুন্সীবাবুর দিকে, কাঁচুমাচু মুখে যতটা সম্ভব সম্ভ্রমের সঙ্গে সে জানতে চায়-

-বাবু আজ কাজ করব্য নাই?

-না, দেখতেই তো পাচ্ছো নিজের চোখে, শ্রমিক ইউনিয়নের সব নেতারা জড়ো হয়ে কেমন হরতাল করছে।

-বাবু আপনার ইখেনে অনেক আশা করে আসা,

-না, না, যাও আগে এই হাঙ্গামাটা হটুক, তারপর দেখা যাবে।

আচমকা হতাশায় তার সমস্ত দেহের রক্ত যেন কেউ সিরিঞ্জ দিয়ে শুষে নিলো, জিভের সমস্ত জল বাষ্পীভূত হয়ে মিলিয়ে গেল যেন কোথায়! খালি পেটেও তার বমি হওয়ার উপক্রম হওয়ায় সে সরে পড়লো একটা হেলে পড়া পাঁচিলের ছায়ার দিকে। দূর থেকে সে শুনতে পেল এক মুন্সী আরেক মুন্সীকে বলছে-

-শালারা যদি ধর্মঘট করবি তাহলে কাজ খুঁজছিস কি জন্য?

অপমানকর ভাষা তার দেহে কাঁটার মতো বিঁধলেও প্রতিবাদের কোন চেষ্টা না করে, নিরুপায় ভাঙ্গা মন নিয়ে, সে সাইকেলের হ্যান্ডেলের মুখকে ঘুরিয়ে নেয় ঘরের দিকে।

ঘরে পৌঁছে সারা ঘর ফাঁকা দেখে সে একটু বিমর্ষ হয়ে যায়, নিজের দীনতাকে গালি দিতে দিতে, ক্ষুধার্ত দেহটিকে টাল খেয়ে পড়ে যাওয়া থেকে সামলে নেয়। ধপাস করে বসে পড়ে চোকলা খসে পড়া ধারির উপর, জীবনের ব্যর্থতাগুলিকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে ভাবতে, তার মাথাটা ঝনঝন করে ওঠে, মূহুর্তে নিজের ব্যর্থতা চাপা দেওয়ার অছিলায়, সে নিজের বৌ ও ছেলে মেয়ের ভুলত্রুটি গুলিকে বিশ্লেষণ করতে করতে ভীষণ গর্জায়।

তিন বছরের ছোট ভাইকে কোলে নিয়ে রুবুকে ঘরে ঢুকতে দেখে সে আরও উগ্ৰ হয়ে ওঠে, প্রায় ধমকের সুরে বলে-

-কোথায় মরছিলি এতখন্, তর মা কোথা গেলছ্যে?

-সিনাতে,

-সিনাতে, আসুক হারামজাদী!

বাবার রক্তাভ চোখ ও মুখের উগ্ৰচন্ডা রূপ দেখে ভয় পেয়ে রুবুর ভাইয়ের হাতের মুঠোয় থাকা আধপাকা কুলগুলি সব মাটিতে পড়ে যায়। রুবু সেই মুহূর্তেই বেরিয়ে পড়ে মায়ের স্নানের ঘাটের দিকে, বাবার উগ্রমূর্তি দেখে ভয় পেয়ে রুবুর পায়ের শিথিলতা ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়। কাটা ধান খেতের লাড়ার ভিতর তার পা দুটো সড়সড় করে এড়িয়ে যায়, হাঁটুর সমান পাড়গুলিও সে প্রাণপণে ডিঙ্গিয়ে যাবার চেষ্টা করে। দূর থেকে শোনা যায় খটখটে হাওয়ায় ঘসা লেগে যাওয়া বাঁশের সাথে বাঁশের মচমচ মচমচ মচমচ একটানা রব।

বহুদূরে সে দেখতে পায় তার মা ও তার সঙ্গীদের। তারা স্নান সেরে বাড়ি ফিরে আসছে। যেন সোনালী রোদের চাঁদোয়ায় চকচকে হয়ে উঠে আসছে গতিশীল কতকগুলো বিন্দু, আর সে দিক থেকে ভেসে আসা বাতাসে কান রেখে সে শুনতে পায় একগুচ্ছ রিনরিনে মেয়েলি গলার সুর।

You may also like