নাম বিভ্রাট

আফিয়া উনুন থেকে হাঁড়ি নামাচ্ছিল। ভাতের গরম ভাপ মুখে লাগতেই চোখ চলে গেল দরজার দিকে। সামিম দাঁড়িয়ে আছে। কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে, কে জানে। হাতে একটা কাগজ। হলদে রং, মাঝখানে ভাঁজ করা। আফিয়া হাঁড়িটা নামিয়ে রাখল। ভাপটা আবার মুখে লাগল। সে আর খেয়াল করল না।

সামিম ভেতরে এল। পায়ের শব্দ নেই। কাগজটা টেবিলে রাখল, যেন কাগজটা কাঁচের তৈরি, ভেঙে যাবে। আঙুল দিয়ে ঠেলে এগিয়ে দিল আফিয়ার দিকে।

“ট্রাইবুনালর নোটিশ আইছে। শুনানির দিন দিছে।”

আফিয়ার হাত থমকে গেল। ট্রাইবুনাল শব্দটা সে শুনেছে। বছরখানেক আগে পাশের গ্রামের একজনের নামে নোটিশ এসেছিল। তারপর আর তাকে দেখা যায়নি। লোকজন বলেছিল, ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে। কীসের ক্যাম্প, কোথায়—কেউ বলতে পারেনি। এখন সেই শব্দটা তার ঘরের ভেতর এসে ঢুকেছে। দেওয়ালে দেওয়ালে লাগছে।

সামিম বলল, “বাবার নামের বানান লইয়া সমস‍্যা অইছে।”

তার গলাটা শুকনো, যেন অনেকক্ষণ জল খায়নি।

আফিয়া কিছু বলল না। হাঁড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল।

রাতে আফিয়া জেগে রইল। শুনল, সামিম এপাশ-ওপাশ করছে। খাটটা কাঁপছে। একসময় উঠে গেল। টেবিলের ওপর কী যেন করছে। আফিয়া চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল, সামিম খাতার ওপর ঝুঁকে বসে আছে। লিখছে, কাটছে। কলমটা চাপ দিয়ে চালাচ্ছে, কাগজ ফুটো হয়ে যাচ্ছে। আফিয়া উঠে গিয়ে দেখল, সামিম তার নাম লিখেছে, তার বাবার নাম লিখেছে, তারপর পুরো নামটা কেটে দিয়েছে। আবার লিখেছে। আবার কেটেছে।

“কিতা করো?” আফিয়া জিজ্ঞেস করল।

সামিম চমকাল। পেছন ফিরে তাকাল। আফিয়া দেখল, তার চোখ দুটো ফোলা, লাল। সে বলল, “বানান ঠিক করিয়ার।”

“বানান তো ঠিক আছে।”

সামিম কিছু বলল না। আঙুল দিয়ে কাটা দাগগুলোর ওপর বোলাতে লাগল। বারবার।

একদিন আফিয়া আলমারি খুলে দেখল, কাগজপত্রের স্তূপ। স্কুলের সার্টিফিকেট, ভোটার তালিকা, জমির দলিল। প্রতিটা কাগজে নামের বানান আলাদা। কোথাও সামিম আলম, কোথাও সামিম আলী, কোথাও শামিম। সামিম বলেছিল, “কোনটা আসল, জানি না।” আফিয়া কাগজগুলো হাতে নিয়ে বসে রইল। ভাঁজ খুলল, আবার ভাঁজ করল। নামগুলো তার চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসছিল।

পরদিন বিকেলে আফিয়া উঠোনে কাপড় শুকোতে দিচ্ছিল। ছেলে ফুটবল খেলছে। হঠাৎ দৌড়ের শব্দ শুনে তাকাল। সামিম। হাঁপাচ্ছে। জামা ভিজে ঘামে। চোখ লাল, ফোলা। ছুটতে ছুটতে উঠোনে ঢুকে সরাসরি ঘরের ভেতর চলে গেল। দরজাটা বন্ধ করে দিল।

আফিয়া কাপড় ফেলে দৌড়ে গেল। দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলল। ভেতরে অন্ধকার। সামিম জানালার পাশে মেঝেতে বসে আছে। হাঁটু বুকের কাছে টেনে নিয়েছে। কাঁপছে।

“কিতা অইছে?” আফিয়া তার সামনে বসে জিজ্ঞেস করল।

সামিম উত্তর দিল না। ঠোঁট কাঁপছে। আঙুলগুলো মেঝেতে আঁচড় কাটছে। আফিয়া দেখল, সামিমের জুতোয় কাদা। মানে সে রাস্তায় ছিল না, মাঠের দিক দিয়ে দৌড়ে এসেছে। আফিয়া তার কাঁধে হাত রাখল। সামিম চমকে উঠল, যেন পুড়ে গেল।

“আর্মির গাড়ি। আমার পিছে পিছে আইছে।”

“কেনে? তুমি তো কিচ্ছু করছো না।”

সামিম কোনো উত্তর দিল না। আফিয়া তার হাত ধরে বসিয়ে রাখল। বাইরে ছেলে ফুটবল থামিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। বলটা হাত থেকে পড়ে গড়াতে গড়াতে উঠোনের কোনায় গিয়ে থামল।

তারপর দিনগুলো অন্য রকম হয়ে গেল। সামিম এখন সারাদিন ঘরে থাকে। আরমান চৌধুরীর গাড়ি চালাত সামিম। এখন চৌধুরি খবর পেয়ে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। মাইনে বন্ধ। আফিয়া সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে, কিন্তু কিছু বলে না। সে জানে, বলে লাভ নেই। সামিম আগে বাজার থেকে খাতা কিনে আনত। এখন পুরোনো কাগজের পেছনেই লেখে।

একদিন ছেলে এসে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, কী লিখো?” সামিম তাকাল। বলতে গিয়ে আটকে গেল। তার নিজের নাম জিভে এল না। ঠোঁট কাঁপছে। ছেলে আবার জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমার নাম কী?” সামিম চোখ নামিয়ে নিল। আফিয়া ছেলেকে টেনে নিয়ে গেল। সামিম তখনো মাটির দিকে তাকিয়ে।

শুনানির দিন এল, তারপর গেল। সামিম যায়নি। আফিয়া কিছু বলেনি। একদিন সকালে দরজায় কড়া নাড়া পড়ল। জোরে। ঠক ঠক ঠক। আফিয়া দরজা খুলল। দুজন পুলিশ। একজন লম্বা, গোঁফওয়ালা। আরেকজন রোগা, হাতে খাতা। গোঁফওয়ালা পুলিশটা আফিয়ার দিকে না তাকিয়েই বলল, “সামিম আলম?”

আফিয়া পেছনে তাকাল। সামিম চেয়ারে বসে আছে। কাঁপছে না। চোখ স্থির। দৃষ্টি দেওয়ালের দিকে। পুলিশ ঢুকল। রোগাটা খাতা খুলে বলল, “ট্রাইবুনালর রায় আহিছে। আপুনার নাম লিস্টত নাই। আপুনি থানাত আহিব লাগিব।”

আফিয়া বলল, “এখন? সকালে?”

রোগাটা আফিয়ার দিকে তাকাল। “হয়।”

আফিয়া বলল, “কিন্তু কাগজপত্র তো ঠিক আছে। বাবার নামের বানান…” রোগাটা মাথা নাড়ল। “আমাক এইবিলাক কই কাম নাই। রায় যি হইছে, হেইমতো আহিব লাগিব।”

গোঁফওয়ালা পুলিশটা সামিমের দিকে তাকাল। “চলিয়ে।”

সামিম উঠে দাঁড়াল। চেয়ারটা পেছনে ঠেলে গেল। আওয়াজটা কাঠের মেঝেতে খসখস করে উঠল। সে আফিয়ার দিকে একবার তাকাল। আফিয়া তার চোখে কিছু পড়তে পারল না। ফ্যাকাশে, শূন্য। সে হাঁটতে শুরু করল। পুলিশের পেছন পেছন।

আফিয়া দরজায় দাঁড়িয়ে দেখল। ছেলে ফুটবল থামিয়ে তাকিয়ে আছে। বলটা পড়ে আছে পায়ের কাছে।

রাতে কখন যে সামিম ফিরেছে, আফিয়া জানে না। গাড়ির শব্দ শুনেছিল নাকি, ঘুমের ঘোরে বুঝতে পারে নি। ঘুম ভেঙে শুধু দেখল, সে দরজার দিকে মুখ করে বসে আছে। যেন এখনো কারও অপেক্ষায়। গলায় আরমান চৌধুরির মাফলার। খায়নি। কথা বলেনি। আফিয়া পাশে বসে ছিল অনেকক্ষণ। ভেবেছিল, কাল সকালে কিছু একটা করবে। কিন্তু রাত কাটতে দিতে হবে। এখন সবাই ঘুমিয়ে। আফিয়া সামিমের হাত ধরে বসিয়ে রাখল। একসময় ঘুমিয়ে পড়েছিল। ভোরে ঘুম ভেঙে দেখল, সামিম নেই।

ভোরের বাতাসে কৃষ্ণচূড়ার লাল পাপড়ি দুলছিল। আফিয়া দরজা খুলে বাইরে এল। গোয়ালঘরের পেছনে গেল, কৃষ্ণচূড়া গাছটার তলায়।

আফিয়া থামল। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। হাত বাড়াল। সামিমের হাত ঠান্ডা হয়ে গেছে। আঙুলগুলো শক্ত হয়ে বাঁকা। যেন শেষ অক্ষরটা লেখা হয়নি। আফিয়া হাতটা নিজের কোলের ওপর তুলে নিল। কিছু বলল না। শুধু বসে রইল।

ছোট্ট ছেলেটা ঘুম থেকে উঠে দরজায় এসে দাঁড়াল। মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর উঠোনে নেমে এল। বলটা কুড়িয়ে নিল। কিছু বলল না। শুধু বলটা বুকে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।

আফিয়া অনেকক্ষণ পর উঠে দাঁড়াল। চোখ মুছে ফেলল। ছেলের দিকে তাকাল। ছেলেটা বল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেছে।

আফিয়া তার কাছে গেল। ছেলেকে জড়িয়ে ধরল। ফিসফিস করে বলল, “তোরে আমি বাঁচাইমু।”

আফিয়া ঘরে ফিরে দরজাটা টেনে দিল। বাইরে কৃষ্ণচূড়া তখনো লাল।

You may also like